২০২৪ সালে রেকর্ড নিট বৈদেশিক সম্পদ অর্জন করেছে জাপান। যদিও ৩৪ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বের শীর্ষ ঋণদাতার অবস্থান হারিয়েছে দেশটি। সে জায়গায় বিশ্বের শীর্ষ ঋণদাতা দেশ হয়ে উঠেছে ইউরোপের বৃহৎ অর্থনীতি জার্মানি।
জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, গত বছরের শেষ নাগাদ জাপানের বৈদেশিক নিট সম্পদ ছিল ৫৩৩ দশমিক শূন্য ৫ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি। এবারই প্রথম জাপান খাতটিতে ৫০০ ট্রিলিয়ন ইয়েনের ঘর পার করল। এছাড়া টানা ষষ্ঠবারের মতো বৈদেশিক নিট সম্পদ অর্জনে রেকর্ড করল দেশটি।
কিন্তু টোকিওর জন্য সর্বোচ্চ রেকর্ড হলেও জার্মানির নিট বৈদেশিক সম্পদ বেড়ে গত বছর হয়েছে ৫৬৯ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ৩ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন ডলার। ৫১৬ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ইয়েন নিয়ে পরের অবস্থানটি চীনের।
বৈদেশিক সম্পদের এ হিসাব আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিবেদন থেকে সংকলন করা হয়েছে। তা গত বছরের শেষ দিকের ইয়েনের বিনিময় হার অনুসারে প্রকাশ করা হয়েছে। বৈদেশিক সম্পদের মোট মূল্য থেকে বিদেশীদের মাধ্যমে মালিকানাধীন অভ্যন্তরীণ সম্পদের মূল্য বাদ দিয়ে নিট বৈদেশিক সম্পদ নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে মুদ্রার মান পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় রাখা হয়েছে। ৩২০ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন ইয়েন নিয়ে নিট বৈদেশিক সম্পদে চতুর্থ স্থানে রয়েছে হংকং এবং এরপর নরওয়ের ২৭১ দশমিক ৮৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনের সম্পদ রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরে জাপান ও জার্মানি দুই দেশে ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর মধ্যে জার্মানির কাছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির মর্যাদা হারিয়েছিল এশিয়ার দেশটি। ১৯৯১ সালে জার্মানির কাছ থেকে শীর্ষ ঋণদাতার আসন ছিনিয়ে নেয় জাপান। এর ৩৪ বছর পর দেশ দুটির অবস্থান বদল ঘটল।
জাপানি অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, এ পরিবর্তনের পেছনে জার্মানির বড় আকারের চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত প্রধান ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া ইয়েনের অবমূল্যায়নের ফলে স্থানীয় মুদ্রায় জাপানের বৈদেশিক সম্পদের মূল্য বেড়েছে, যার মধ্যে রয়েছে স্টক, বন্ড ও অন্যান্য সম্পদ।
শক্তিশালী রফতানি কার্যক্রমের কারণে গত বছর জার্মানির চলতি হিসাব উদ্বৃত্ত পৌঁছে ২৪৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরোয়। অন্যদিকে জাপানের উদ্বৃত্ত ছিল ২৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ১৮০ বিলিয়ন ইউরো। গত বছর ইউরো-ইয়েন বিনিময় হার প্রায় ৫ শতাংশ বাড়ে। এর ফলে ইয়েনে জার্মান সম্পদের মূল্য জাপানের তুলনায় অনেক বেশি দেখাচ্ছে।
শীর্ষ অবস্থান হারানোকে গুরুতরভাবে দেখছে না বলে জানিয়েছে জাপান সরকার। দেশটির মুখপাত্র ইয়োশিমাসা হায়াশি বলেন, ‘নিট বৈদেশিক সম্পদ বিভিন্ন উপাদানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে আর্থিক সম্পদ ও ঋণ বাবদ সুদহারে পরিবর্তন ও পেমেন্ট ব্যালান্স। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে এবং জাপানের নিট বৈদেশিক সম্পদ ধারাবাহিকভাবে বাড়ার মতো বাস্তবতায় শুধু অবস্থান পরিবর্তনকে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা উচিত নয়।’
গত বছর জাপানের মোট বৈদেশিক সম্পদ ১১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬৫৯ দশমিক শূন্য ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন। এতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডসের ব্যবসায়িক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা এফডিআই। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, ফাইন্যান্স, ইন্স্যুরেন্স ও খুচরা খাতে জাপানি বিনিয়োগকারীরা খরচ করেছেন।
একই সময়ে নিট বৈদেশিক ঋণও টানা সপ্তম বছরের মতো বেড়েছে। ২০২৪ সালে জাপানের বৈদেশিক দায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১২৫ দশমিক ৯৭ ট্রিলিয়ন বা প্রায় ৭ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। ইয়েনের অবমূল্যায়নের বিষয়টি এখানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। কারণ ২০২৪ সালের শেষে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১৫৭ দশমিক ৮৯ ইয়েন, যা এক বছর আগের তুলনায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
অবশ্য আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, জাপানের নিট বৈদেশিক সম্পদ দাঁড়ায় ৫১৬ দশমিক ২৮ ট্রিলিয়ন ইয়েন, যা চীনের চেয়ে কম। এর বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ নিট ঋণগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যার দায় বৈদেশিক সম্পদের চেয়ে ৪ হাজার ১০৯ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ২৬ দশমিক শূন্য ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বেশি।
বিদেশে জাপানি এফডিআই প্রবাহ সম্পর্কে মিজুহো ব্যাংকের বাজার বিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ দাইসুকে কারাকামা বলেন, ‘এখন জাপানিরা আরো বেশি এফডিআই বিনিয়োগ করছেন। এর মানে, এ অর্থ সহজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। যখন ঝুঁকি দেখা দেয়, তখন দেশীয় বিনিয়োগকারীরা সহজেই বৈদেশিক বন্ড ও সিকিউরিটিজ বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু যেসব বিদেশী কোম্পানি তারা অধিগ্রহণ করেছেন, সেগুলো থেকে এত সহজে সরে আসা সম্ভব নয়।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, জাপানি কোম্পানিগুলো ভবিষ্যতে বিদেশে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবে কিনা তা কিছু প্রবণতার ওপর নির্ভর করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতি কী ধরনের সিদ্ধান্তের ওপর পরিচালিত হবে তার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে পারেন জাপানি বিনিয়োগকারীরা। যেমন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি কার্যকর থাকায় কিছু কোম্পানি উৎপাদন স্থানান্তর বা সম্পদ স্থানান্তর করে যুক্তরাষ্ট্রে ঝুঁকি হ্রাস করার চিন্তা করতে পারে।